advertisement

ইসলাম অভি

advertisement

‘নুন খাই যার গুণ

গাই তার’ প্রবাদ থেকে বোঝা যায় পৃথিবীর ইতিহাসে লবণের

advertisement

গুরুত্ব কতখানি। আধুনিক সভ্যতায় লবণের সহজলভ্যতার কারণে হয়তো আমরা এর গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি না, কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, একসময় লবণ নিয়ে যুদ্ধও হয়েছে পৃথিবীতে। লবণ নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেনÑ আজহারুল

ইসলাম অভি

লবণাক্ততার উদ্ভব : লবণাক্ততা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার শুরু হয় স্যার এডমন্ড হ্যালির ১৭১৫ সালের তত্ত্ব থেকে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, সমুদ্রের জলের লবণ ও অন্যান্য উপাদান মাটি থেকে বৃষ্টির সঙ্গে নদীর জলে মিশে সাগরে এসেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এভাবে নদী হয়ে সাগরে মিশতে মিশতে লবণগুলো জমতে থাকে। হ্যালি আরও যুক্ত করেন যে, যেসব সাগরের সঙ্গে মহাসাগরের কোনো সংযোগ নেই, সেগুলোয় লবণাক্ততা বেশি। হ্যালি এই প্রক্রিয়াকে ‘কন্টিনেন্টাল ওয়েদারিং’ হিসেবে অভিহিত করেন। হ্যালির প্রদত্ত এই তত্ত্ব আংশিক সঠিক। আসলে যখন সমুদ্র গঠন হয়, তখন সমুদ্রতল থেকে সোডিয়াম নিঃসৃত হয়। লবণের অন্য আরেকটি আয়ন ক্লোরাইড, এসেছে সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরির উদ্গিরণ ও হাইড্রোথার্মাল ছিদ্র থেকে, যাতে অন্যান্য গ্যাসের সঙ্গে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ছিল। সমুদ্রে এভাবে আয়ন সোডিয়াম ও ক্লোরাইড মিশে ধীরে ধীরে সমুদ্র লবণ গঠন করে।

লবণের প্রাচীন ব্যবহার ও লবণের রাস্তা : খাওয়ার পাশাপাশি আরও বিভিন্ন কাজে লবণের ব্যবহার শুরু হয়ে আসছে অনেক বছর আগে থেকেই। হাজার হাজার বছর আগে প্রাচীন মিসরীয়রা লবণকে পবিত্র বলে মনে করত। তাই তারা কবরে লবণ রাখত। মৃতদেহ লবণ দিয়ে মাখালে তা টিকে থাকে অনেক দিন। তাই তারা মৃত মানুষের কবর দেওয়ার সময় লবণ রেখে দিত। লবণের অন্য ধরনের ব্যবহারও তখন থেকে চালু হয়ে আসছে। লবণ মাখিয়ে খাবার সংরক্ষণ করার উপায় বের করেছিল মিসরীয়রাই। মিসরীয়রা মাছে লবণ মাখিয়ে বিক্রি করত ফিনিশীয়দের কাছে। লবণের নানা ধরনের ব্যবহারের ফলে এর ব্যবসা অনেক জমজমাট হয়ে ওঠে। লবণ বিক্রির জন্য আফ্রিকায় একটি আলাদা রাস্তা তৈরি হয়েছিল। সেই রাস্তা আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির মধ্য দিয়ে গেছে। এ রাস্তা দিয়ে টুয়ারেগ নামের এক জাতি বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন লবণ নিয়ে যেত।

লবণ নিয়ে যুদ্ধ : লবণ যে শুধু মানুষের জীবনে কল্যাণ বয়ে এনেছে, তা কিন্তু নয়। অনেক যুদ্ধও কিন্তু এই লবণের কারণে হয়েছিল। ইতালির ভেনিস শহরের সঙ্গে জেনোয়া নামের আরেকটি শহরের লড়াই ঘটেছিল শুধু লবণকে কেন্দ্র করে।

লবণ সরবরাহ থেকে বন্দরের উৎপত্তি : লবণ নিয়ে আরও একটি মজার ঘটনা আছে। ১৮০০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের এক জায়গায় লবণ পাওয়া যায়। এই লবণ সরবরাহ করতে গিয়েই লিভারপুল নামে এক বিশাল বন্দর গড়ে ওঠে।

আমেরিকার ইতিহাসে লবণ নিয়ে যুদ্ধ : আমেরিকার ইতিহাসে লবণ নিয়ে ধারাবাহিক যুদ্ধ দেখা যায়। লবণের সরবরাহ যিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, তিনিই ক্ষমতার চেয়ারে বসতেন। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে এটাই ছিল আমেরিকার চিত্র। এমনকি তারা আসার পর আমেরিকান সিভিল ওয়ার পর্যন্ত লবণের এ গুরুত্ব অব্যাহত ছিল। আমেরিকার সব সভ্যতাই লবণ সহজলভ্য এমন এলাকায় গড়ে উঠেছে।

লবণের দখল আর স্বাধীনতার আরও নমুনা ইতিহাসে দেখা যায়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ নিয়ে ১৯৩৯ সালে নির্মিত ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র ‘গন উইদ দ্য উইন্ড’ দেখিয়েছে যে, যুদ্ধের সময় দক্ষিণাংশে একটি কামানও তৈরি হয়নি। তবে দক্ষিণের পরাজয়ে এ অস্ত্র সংকটই একমাত্র কারণ নয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণে পর্যাপ্ত পরিমাণ লবণ উৎপাদন হয়নি। দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ভার্জিনিয়া, কেন্টাকি, ফ্লোরিডা ও টেক্সাস মিলে উৎপাদন করেছিল ২৩ লাখ ৬৫ হাজার বুশেল লবণ আর নিউইয়র্ক, ওহিও ও পেনসিলভানিয়া উৎপাদন করেছিল ১ কোটি ২০ লাখ বুশেল লবণ। লবণ উৎপাদনের এ পার্থক্য গৃহযুদ্ধের জয়-পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র লবণের বিরাট ভোক্তা হয়ে ওঠে, আমেরিকানরা ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি লবণ গ্রহীতা হয়ে পড়ে।

পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক পণ্য : লবণ বিশ্বের অন্যতম প্রথম আন্তর্জাতিক পণ্য; লবণের উৎপাদন বিশ্বের প্রথম শিল্পের একটি এবং অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রথম মনোপলি বাণিজ্য সৃষ্টি হয় এ পণ্যকে কেন্দ্র করে।

লবণের কিছু ভালো দিক : নার্ভ সেলের কার্যকলাপের জন্য লবণ খুবই দরকারি। লো ব্লাড প্রেসারের জন্য লবণ উপকারী। সর্দি কমানোর জন্য, সাইনাসের কনজেশন ভাব দূর করার জন্যও লবণ বেশ কাজ করে। পেশির ব্যথা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও লবণ সমান জরুরি। শুষ্ক কাশির সময় মুখে সামান্য লবণ রাখলে ঘন ঘন কাশির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়। ব্লাড ভেসেল ও সেলগুলোকে লবণ কিছুটা সংকুচিত করে রাখে বলে শরীর গরম থাকে। এ কারণেই শীতকালে লবণ খাওয়া হয় বেশি। সামুদ্রিক লবণ সিলিকন, ক্যালসিয়াম, কপার, নিকেলসমৃদ্ধ। সামুদ্রিক লবণে উপস্থিত এসব মিনারেল ও অন্যান্য উপাদান ব্লাডসেল রক্ষা করতে সাহায্য করে। সাধারণ লবণের মধ্যে এত রকমের মিনারেল উপস্থিত থাকে না।

ডোরাকাটা লবণের খনি

বর্তমানে পোল্যান্ড, তুরস্ক,

বলিভিয়াসহ আরও কিছু দেশে এখনো লবণের খনির দেখা মেলে। আস্ট্রিয়ার একটি এলাকার নাম সলজবুর্গ, যার মানে হলো লবণের শহর। এ এলাকাটি ১৭ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি লবণের খনি। তেমনি সেল্টিক বা স্কটল্যান্ড, গ্রিক ও মিসরের বিভিন্ন এলাকার নাম হয়েছে এই লবণের কারণে। ইতালির দক্ষিণাঞ্চলে সিসিলিতে অপরূপ ডোরাকাটা লবণের একটি খনি দেখতে পাওয়া যায়। খনিটি প্রায় ২০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে আছে। আজ থেকে প্রায় ৫০ লাখ বছর আগে ভূমধ্যসাগর আংশিক বা সম্পূর্ণ শুকিয়ে যাওয়ার সময় এই অসাধারণ প্যাটার্নটি তৈরি হয়। পানির বাষ্পীভবনের ফলে পড়ে থাকা লবণই কালক্রমে কালোর মাঝে সাদা ও গোলাকার ডোরা

তৈরির মূল কারণ।

লবণ

নিয়ে গান্ধীর

আন্দোলন

ব্রিটিশরা ভারতে স্থানীয় বাণিজ্য ধ্বংসের জন্য বিভিন্ন কালাকানুন তৈরির আগে এখানে লবণের পর্যাপ্ত ও সহজ জোগান ছিল। ভারতের অনেক জায়গাতেই লবণের উৎস ছিল না, কিন্তু উপকূলীয় অঞ্চলে প্রচুর লবণ উৎপাদন হতো এবং বিভিন্ন স্থানে লবণযুক্ত শিলা ও লবণাক্ত হ্রদ ছিল। তাই ভারতে কখনই লবণের কোনো সংকট ছিল না। লবণ উৎপাদনের বিবরণী প্রাচীনকালেই পাওয়া যায়। তবে তখন ধার্মিক হিন্দুরা সাগরের নোনা জল শুকিয়ে তৈরি লবণ ছাড়া অন্য কোনো উৎসের লবণ ব্যবহার করত না। ভারতের পশ্চিম উপকূল গুজরাটে লবণ উৎপাদনের ইতিহাস পাঁচ হাজার বছর পুরনো। নয় হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত ‘কচ্ছের রান’ জলাভূমির সঙ্গে সাগরের সংযোগ আছে। এখানকার জল শুকিয়ে লবণ তৈরি হতো। কলকাতার উপকূলেও লবণ তৈরি হতো। বর্তমান পাকিস্তান উপকূলেও ছিল লবণ তৈরির ইতিহাস। বাংলায় ব্রিটিশরা উড়িষার লবণ দিয়ে বাণিজ্য করত। আঠারো শতকে ফরাসিদের সঙ্গে ব্রিটিশদের যুদ্ধে তাদের গানপাউডারের জন্য প্রয়োজনীয় লবণের বেশিরভাগ এসেছিল উড়িষা থেকে। ব্রিটিশরা আসার আগে থেকেই ভারতে লবণের পরিবহন ও বাণিজ্যে সামান্য করের প্রচলন ছিল। তবে ব্রিটিশরা এসে তাদের বাণিজ্যস্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। ইংল্যান্ডে উৎপাদিত লবণ দামে ও মানে উড়িষার লবণের সামনে কুলোতে পারত না। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা উড়িষায় উৎপাদিত সব লবণ কিনে নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু উড়িষার মারাঠা গভর্নর রঘুজি ভোঁসলা ব্রিটিশদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি বুঝেছিলেন এ লবণের দখল নিয়ে তারা তাদের দেশে উৎপাদিত লবণ এ দেশে চড়া দামে বিক্রির পরিকল্পনা করছে। রঘুজি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ব্রিটিশরা বাংলায় উড়িষার লবণ বিক্রি নিষিদ্ধ করে। লবণ নিয়ে ব্রিটিশদের এ বাণিজ্য মনোভাব পরবর্তী সময়ে আরও নানা ফন্দিফিকির করেছিল। তখন বাংলা আর উড়িষার সীমান্তে শুরু হয় লবণ চোরাচালান। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশরা উড়িষা দখল করে নেয় এবং ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে এক ঘোষণার মাধ্যমে সেখানকার লবণের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দাবি করে। বেসরকারি ব্যবসায়ীদের লবণ বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। যেসব ব্যবসায়ীর লবণের মজুদ ছিল, তাদের নির্ধারিত দামে সেগুলো সরকারের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়। ১০ বছরের মধ্যে ভারতে ব্রিটিশরা বাদে অন্য সবার লবণ উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। আবার পরবর্তীকালে গান্ধীজি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লবণ আইন ভঙ্গ করে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন করেছিলেন। যেটিকে লবণ আইন অভিযান বা লবণ সত্যাগ্রহ বলা হয়। ইংরেজিতে একে সল্ট মার্চ বলে অবিহিত করা হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই আন্দোলনের বিশেষ মর্যাদা ছিল। আর এই লং মার্চের আহ্বায়ক ছিলেন স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী। লবণের ওপর ব্রিটিশ সরকার যে কর আরোপ করে, তারই প্রতিবাদে এই যাত্রার আয়োজন করা হয়। লাখ লাখ মানুষ সেদিন গান্ধীজির যাত্রায় সঙ্গী হয়েছিল। ভাবা যায়? লবণের জন্য রীতিমতো লং মার্চ।